বিনিয়োগের হাহাকার, বৈদেশিক বিনিয়োগ থমকে গেছে
বাংলাদেশের বিনিয়োগের পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে উদ্বেগজনক। ছোট-মাঝারি ও বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়া, বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশটি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ উন্নয়নে একটি নতুন মাত্রা আনার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে তরুণ ব্যাংকার আশিক চৌধুরীকে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) শীর্ষপদে নিয়ে আসা হয়। তবে ১৬ মাসের নেতৃত্বের পরেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য চমক দেখা যায়নি।
দেশের অর্থনৈতিক খাতের কিছু সূচক স্থিতিশীল হলেও, বিনিয়োগের হার কমে গেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের জিডিপি অনুপাতে বিনিয়োগ ছিল ২৩.৫১%, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ২২.৪৮%-এ। সেই বছর মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ছিল ২৮১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯% কম। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহও ছয় মাস ধরে ৭%-এর নিচে রয়েছে, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় এটি ছিল ১০%-এর বেশি।
বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেশি, আর রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত। এছাড়া ব্যাংকের ঋণের সুদ ও বিভিন্ন প্রকার খরচের কারণে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিট এফডিআই বৃদ্ধি সত্ত্বেও নতুন বিনিয়োগ এসেছে খুব কম। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নতুন এফডিআই ছিল মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছর নতুন বিনিয়োগ ছিল ৬৭ কোটি ডলার। করোনাকালের সময় নতুন বিনিয়োগ আরও বেশি ছিল।
আশিক চৌধুরী বলেন, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে ২০২৪ সালের বাস্তবতা দেখার পর ২০২৫ সালে কেন কেউ বিনিয়োগ করবেন, তা স্পষ্ট। দেশে দিকনির্দেশনা অনিশ্চিত ছিল। তবু কিছু প্রবাহ হয়েছে, যার মানে দেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সন্দিহান নয়। এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
চলমান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলার অপ্রতুলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, চট্টগ্রাম বন্দরের খরচ ও জটিলতা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সব কারণে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ছাড়া নতুন বিনিয়োগের আশা কম।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মন্তব্য করেন, আশিক চৌধুরীকে নির্বাহী চেয়ারম্যান করে আমরা আশাবাদী ছিলাম। সাহসী সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হবে। কিন্তু গত দুই বছরে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়নি। যা হয়েছে, তা নগণ্য।
আশিক চৌধুরী এই সময়ে বিদেশ সফর ও বিনিয়োগ সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন। তবে তার কার্যকর প্রভাব বিদেশি বিনিয়োগে সীমিত; যুক্তরাজ্য থেকে এফডিআই কমেছে ৪১%, বেইজিং সফরের পর নিট বিনিয়োগও কমেছে।
কাজের ফাঁকে ব্যক্তিগত রোমাঞ্চের শখও রয়েছে - স্কাই ডাইভিংয়ে বিশ্ব রেকর্ড করা তার অন্যতম। কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশে সেই চমক দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থায়ী সংস্কার, নীতি ধারাবাহিকতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। তা না হলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকলেও নতুন বিনিয়োগ সীমিত থাকবে।





































