সোমবার , ১৩ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৪৫, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

অর্থনীতির প্রায় সব সূচক নেতিবাচক

অর্থনীতির প্রায় সব সূচক নেতিবাচক

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা ও বিনিয়োগে আস্থাহীনতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। গতকাল রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) জানুয়ারি ২০২৬ অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়, বিনিয়োগ পরিবেশ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো গভীর।

ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা নভেম্বরের তুলনায় আরো বেশি। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান চালিকাশক্তি।

যদিও চালের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবু মাছ, দুধ, ডিম ও অন্যান্য প্রোটিনজাত পণ্যের দাম বেড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে। একই সময়ে অখাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামগ্রিকভাবে কমেনি। এর বিপরীতে মজুরি  মজুরি মূল্যস্ফীতি প্রায় স্থবির থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে দাম ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান আরো বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে, যা সামগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানি নির্ভরতার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমছে না বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিও এই অনিশ্চয়তাকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।

অর্থাৎ মানুষ সঞ্চয় করলেও সেই অর্থ উৎপাদন ও বিনিয়োগে প্রবাহিত হচ্ছে না। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক ঋণপ্রবাহকে বাড়িয়ে দেখালেও বাস্তবে তা বেসরকারি খাতের জন্য সুযোগ সংকুচিত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতার কারণে সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে একদিকে সুদহার উঁচু থাকছে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। উচ্চ সুদহার, ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্পষ্টতা মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ছে।

ফলে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় ফিরছে না।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন খাতে কিছুটা ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নির্মাণ ও উৎপাদন কার্যক্রমে গতি ফেরার ইঙ্গিত দেয়। কৃষি খাতও আগের সংকোচন কাটিয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে, যদিও জলবায়ু ঝুঁকি ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এই খাতের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

অন্যদিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এখনো অসম। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতে এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, আর্থিক খাতে সংস্কার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজস্ব খাতে দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর আরেকটি বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর—সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। যদিও নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে রাজস্ব আদায় ২২ শতাংশ বেড়েছে এবং বছরওয়ারি হিসাবে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবু সামগ্রিক রাজস্ব ঘাটতি সরকারকে আরো বেশি অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সুদ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

বৈদেশিক খাতে তুলনামূলকভাবে স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ডিসেম্বর শেষে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। ছয় মাসে রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসে এসেছে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

রপ্তানি খাতেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও বৈচিত্র্যহীনতা বড় দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। পোশাক খাতই এখনো দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসা। ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানি বাড়লেও অন্যান্য খাতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে স্থবির, যা দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক আয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা রাখে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ জোরদার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণনির্ভরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতা অর্থনীতির গতি দীর্ঘ সময়ের জন্য শ্লথ করে দিতে পারে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়