আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন ‘পূর্ণ গ্রহণযোগ্য’ নয়
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশি ও বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন কঠোর গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এমন একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যার পাশে একটি ‘দাগ বা প্রশ্নচিহ্ন’ থেকে যাবে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আগ্রহ দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত। ফলে রাজনীতি থেকে দলটির পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আপাতত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও ভবিষ্যতে দলটির পুনরুত্থানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আল–জাজিরাকে বলেন, আওয়ামী লীগ মানে শুধু দলটির নেতৃত্ব নয়। দলটি সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক নানা শক্তির সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, দলটির বর্তমান রাজনৈতিক দুরবস্থার পরও এ বাস্তবতা বদলায়নি।
আনু মুহাম্মদের ভাষায়, আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আগ্রহ দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়েও অনেক গভীরে বিস্তৃত। ফলে রাজনীতি থেকে দলটির পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও জনসমর্থনের উত্থান আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনরুত্থানের ক্ষেত্রে একধরনের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করতে পারে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এখনও বিতর্কিত এবং আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে সেই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অতীতে দুই দফা নিষিদ্ধ হওয়া এবং শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ডের পরও জামায়াতে ইসলামীর টিকে থাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দলটির শক্ত অবস্থান আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বয়ান নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাব; যাকে আধিপত্যের প্রদর্শন বলা যায়, বিস্ময়করভাবে আওয়ামী লীগের জন্য একধরনের আশীর্বাদ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল–জাজিরাকে বলেন, কঠোর গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে আওয়ামী লীগকে ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এমন একটি নির্বাচন হবে, যার পাশে একটি ‘দাগ বা প্রশ্নচিহ্ন’ থেকেই যাবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত দমন–পীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা এবং নির্বাচনী মাঠ নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার অতীত ভূমিকার কারণে অনেক বাংলাদেশির চোখে আওয়ামী লীগ একটি বৈধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেলেও এসব নির্বাচনে কারসাজির অভিযোগ ছিল। বিরোধী দলগুলোর বর্জন, গ্রেপ্তার ও দমন–পীড়নের অভিযোগ ওই নির্বাচনগুলোকে বিতর্কিত করে তোলে।
তবু কুগেলম্যান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বংশানুক্রমিক নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো খুব কমই বিলুপ্ত হয়। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ আপাতত একটি ‘অপেক্ষা করার কৌশল’ অবলম্বন করতে পারে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলে রাজনৈতিক সমীকরণের ভেতরে থাকতে চাইবেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে সামনে আনার পথও খোলা রাখতে পারেন।
কুগেলম্যানের ভাষায়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি হলে আওয়ামী লীগ আবারও একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ফিরে আসতে পারে।
রাজবাড়ী জেলার নৌকাচালক রিপন মৃধা নিজেকে আজীবন আওয়ামী লীগের ভোটার হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, দলটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে।
প্রায় ৫০ বছর বয়সী এই মাঝি জানান, ভোট না দিলে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় করছেন তার পরিবারের সদস্যরা। আবার ভোট দিলেও ঝুঁকি রয়েছে—এমন দোটানার মধ্যেই আছেন তারা।
রিপন মৃধা বলেন, আমরা যদি ভোট না দিই, তাহলে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারি। সে কারণেই পরিবারের সবাই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই সময় আওয়ামী লীগ কীভাবে টিকে থাকার লড়াই করেছিল, সে কথা তার বাবা প্রায়ই বলতেন। তার মতে, আওয়ামী লীগ এর আগেও বড় সংকট পার করেছে।





































